মৌলিক রং কি এবং যে কারণে রঙিন ছাপায় মৌলিক রং আলাদা

শিহাব উদ্দিন আহমেদ | ফেব্রুয়ারী ১২, ২০১৮

মৌলিক রং তো তিনটি: লাল, সবুজ আর নীল। কিন্তু প্রিন্টারে রঙিন প্রিন্ট নেয়ার জন্য যে তিন ধরনের রং থাকে তা হচ্ছে: গাঢ় গোলাপি, হলুদ এবং সায়ান বা সবুজাভ নীল। মৌলিক রঙের ধারণাটি কি এখানে প্রযোজ্য নয়?

তড়িৎচুম্বক তরঙ্গের পাল্লা গামা রশ্মি থেকে শুরু করে বেতার তরঙ্গ পর্যন্ত হলেও কেবল যে অংশটুকু দেখতে পাই তাকেই আমরা দৃশ্যমান আলো বলছি। এই দৃশ্যমান আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য মোটামুটিভাবে ৩৮০ ন্যানোমিটার থেকে ৭০০ ন্যানোমিটার।

আলোর এই তরঙ্গদৈর্ঘ্যই নির্ধারণ করে দেয় তা আমাদের চোখে কি রঙের আলো হিসেবে ধরা দেবে। যদি কোন টর্চ লাইট থেকে ৪০০ ন্যানোমিটার তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো নি:সৃত হয় আমাদের মনে হবে সেখান থেকে বেগুনী রঙের আলো নি:সৃত হচ্ছে। আর ৭০০ ন্যানোমিটারের ক্ষেত্রে মনে হবে টর্চ লাইটটির আলো লাল।

নিউটন তার বিখ্যাত প্রিজম পরীক্ষার মাধ্যমে সূর্যের আলোকে বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যে বিশ্লেষণ করে প্রমাণ করেছিলেন যে সূর্যের আলো আসলে সাত রঙের সমষ্টি। যার সাহায্যে রঙধনুর ঘটনা ব্যাখ্যা করা যায় এবং বাংলায় আমরা সাতটি রঙকে সংক্ষেপে ‘বেনীআসহকলা’ বলে থাকি।

বেনীআসহকলা: বেগুনী, নীল, আসমানি, সবুজ, হলুদ, কমলা এবং লাল।

Prism esperiment

সাদা রঙ থেকে সাতটি রঙ

সাদা রঙের ব্যাখ্যা:

নিউটনই আবার প্রমাণ করেছিলেন যে সূর্যের আলোর সাতটি রঙ মিশিয়ে সাদা রঙ তৈরি করা যায়।

Prism experiment

সাতটি রঙের সমন্বয়ে সাদা রঙ

আপনার কাছে যদি এমন সাতটি টর্চ বা অন্য কোন আলোক উৎস থাকে যেগুলোর প্রত্যেকটি থেকে সাতটি আলাদা আলাদা রঙের আলো নি:সৃত হয় তবে সাতটি টর্চ একত্রে জ্বালিয়ে আপনি সাদা রঙের আলো সৃষ্টি করতে পারবেন। অর্থাৎ সাদা হচ্ছে সব রঙের সমাহার। আর কালো হচ্ছে রঙের অনুপস্থিতি বা অন্ধকার

মৌলিক রং

তবে সাদা রং সৃষ্টির জন্য সাতটি রং জরুরি নয়। কেবল তিনটি রঙের মাধ্যমেই সাদাসহ যেকোনো রঙে সৃষ্টি সম্ভব। এই তিনটি রঙকে বলা হয় মৌলিক রং (Primary color)। যেমন লাল ও সবুজ রঙের সমন্বয়ে হলুদ রং সৃষ্টি হয়। নিচের চিত্রের মাধ্যমে এটি দেখানো হল।

additive primary photo

চিত্র- ১

আমাদের চোখও তিনটি মৌলিক রঙের মাধ্যমেই রঙ সনাক্ত করে। কাজেই কোন আলোক উৎসের আলো কোন রঙের হবে হবে তা নির্ভর করছে সেখানে কোন কোন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো আছে এবং কোন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলোর প্রভাব বেশি তার ওপর।

কিন্তু শুরু করেছিলাম যে প্রশ্নের মাধ্যমে-

প্রিন্টারে কেন অন্য তিনটি রঙকে মৌলিক রঙ হিসেবে ব্যবহার করা হয়?

টর্চ লাইট বা যেকোনো আলোক উৎস থেকে নি:সৃত আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য নির্ধারণ করে দেয়ে আলোর রং কি হবে। কিন্তু বস্তুর রঙের বিষয়টি একটু আলাদা।

যেমন ধরুন দিনের আলোয় আপনি একটি হলুদ শার্ট গায়ে চাপিয়েছেন। এর অর্থ হচ্ছে আপনার শার্টটি সূর্যের আলোয় থাকা ছয়টি রং শুষে নিলেও হলুদ রঙটি শুষে নিতে পারছে না। অর্থাৎ আপনার শার্ট থেকে কেবল হলুদ রঙের আলো প্রতিফলিত হচ্ছে। কাজেই কোন বস্তুকে আমরা কি রঙের বস্তু হিসেবে দেখতে পাবো তা নির্ভর করছে বস্তুটি কোন কোন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো কি মাত্রায় প্রতিফলিত করছে তার ওপর।

বস্তুটি যদি কোন রঙ শুষে নিতে না পারে তবে সেটিকে সাদা দেখাবে। আর যদি সব রঙই মোটামুটিভাবে শুষে নেয় তবে সেটিকে কালো দেখাবে।

এদিকে আপনার কম্পিউটারের মনিটরের কথা চিন্তা করুন। সেটি রঙের প্রতিফলন ঘটায় না। সেটি নিজেই আলোর উৎস। সেটি কোন রঙের আলোর নি:সরণ না ঘটানোর অর্থ সেটিকে কালো দেখাবে। আর সব রঙের আলোর নি:সরণ ঘটানোর অর্থ সেটিকে সাদা দেখাবে। নিচের ছক দেখুন:

বস্তু কম্পিউটার মনিটর বা কোন আলোর উৎস
কোন রঙ শুষে নিতে পারছে না: সাদা কোন রঙের আলো নিঃসৃত হচ্ছে না: কালো
সব রঙ শুষে নিচ্ছে: কালো সব রঙের আলো নি:সৃত হচ্ছে: সাদা

 

কাজেই কাগজে ছবি বা রঙিন লেখা ছাপার সময় অন্যভাবে ভাবতে হয়। কালো লেখার জন্য কালো কালি ব্যবহার করা হয়। সেজন্য আলাদাভাবে কালো রঙের ব্যবস্থা থাকে। এর বাইরে থাকে আরও তিনটি রং, যেগুলো দিয়ে পছন্দমত যেকোনো রং সৃষ্টি করা যায়।

মৌলিক রঙ এবং পরিপূরক বা হ্রাসমূলক মৌলিক রঙ

লাল, সবুজ আর নীল এই তিনটি মৌলিক রঙকে বলা হয় অ্যাডিটিভ কালার (primary additive color) কারণ এগুলো মিশিয়ে আপনি বিভিন্ন রং তৈরি করেন। চিত্র: ১ আবার লক্ষ্য করুন।

  • লাল, সবুজ আর নীল মিলে তৈরি হচ্ছে সাদা।
  • লাল আর সবুজ মিলে তৈরি হচ্ছে হলুদ।
  • এবার হলুদ আর নীল মিলে তৈরি হচ্ছে সাদা।

হলুদকে বলা হয় পরিপূরক (complementary) রং। এরকম তিনটি পরিপূরক রং আছে: হলুদ, গাঢ় গোলাপি এবং সায়ান বা সবুজাভ নীল। যেগুলোর প্রত্যেকটি কোন একটি মৌলিক রঙের সাথে মিলে সাদা রঙ সৃষ্টি করতে পারে।

এই পরিপূরক (complementary) রঙগুলোকে হ্রাসমূলক মৌলিক (subtractive primary) রঙও বলা হয়। কারণ সাদা রঙ থেকে কোন একটি সরিয়ে নিয়ে আপনি রংগুলো তৈরি করতে পারেন। যেমন: সাদা রঙ থেকে নীল রঙটি সরিয়ে নিলে আপনি হলুদ রং পেয়ে যাবেন।

আবার সবগুলো রং সরিয়ে নিলে কালো রং পাওয়ার কথা। এখানেও তার ব্যতিক্রম নেই। সবগুলো হ্রাসমূলক মৌলিক (subtractive primary) রং অর্থাৎ হলুদ, গাঢ় গোলাপি এবং সায়ান এর সমন্বয়ে আপনি কালো রং পেয়ে যাবেন। নিচের চিত্র দেখুন:

Subtractive primary photo

পরিপূরক বা হ্রাসমূলক মৌলিক রঙ

কেবল প্রিন্টারে রঙিন ছবি ছাপা নয়, চিত্রশিল্পীরাও এ কৌশল ব্যবহার করে থাকেন। তবে সব রং মিশিয়ে কালো রং তৈরির চেয়ে সরাসরি কালো রং-ই বেশি কার্যকরী। তাই প্রিন্টারে কালো কালির আলাদা একটি ট্যাঙ্ক থাকে।

Print Friendly, PDF & Email
  • comments powered by Disqus
  • আরও পড়ুন:

  • প্রশ্ন ও উত্তর: